বাধ্যতামূলক অবসরে ২২ ডিসি : গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
মুহাম্মদ মুসা খান
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত ‘বিতর্কিত নির্বাচন পরিচালনার জন্য’ রিটার্ন অফিসার তথা জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘বিতর্কিত তিনটি সংসদ নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত) কারচুপিতে ভূমিকা রেখে’ ‘শেখ হাসিনাকে অবৈধ ভাবে ক্ষমতায় রাখা’’ ও ‘স্বৈরাচারি হতে সহায়তার’’ অভিযোগে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে থাকা সাবেক জেলা প্রশাসকদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নিয়েছে। এদের মধ্যে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর হয়েছে, তাদের ২২ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। এই ২২ ডিসি এখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগসহ নানান পদে অতিরিক্ত সচিব ও সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এর আগে বুধবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে কর্মরত যুগ্ম সচিব ও সমপর্যায়ের পদে থাকা প্রশাসনের ৩৩ জন কর্মকর্তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করেছিলো সরকার। তাঁরাও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ‘বিতর্কিত নির্বাচনে’ রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন সিনিয়র সচিব মোখলেস-উর রহমান বলেন, “২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত -প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে যেসব কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছেন- তাঁরা প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে অপরাধ করেছেন। তাঁরা অন্যায়ের কোনো প্রতিবাদ করেননি”। তিনি বলেন, “বিতর্কিত নির্বাচনে যারা রিটার্নিং কর্মকর্তা ছিলেন, তাঁরা নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছিলেন। তাদের মধ্যে ইতিমধ্যে ৪৩ জনকে ওএসডি করা হয়েছে”। আর যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকবে, তাদের বিষয়গুলো দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হবে। সাবেক ডিসিদের বাইরেও অন্য কর্মকর্তাদের বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাদের নামে দুর্নীতির অভিযোগ আছে বা যারা আইনের বাইরে গিয়ে অতিরঞ্জন কাজগুলো করেছেন, তাঁরা চাকরিবিধি অনুযায়ী সাজা পাবেন।’’ তিনি বলেন, তাঁরা (ওই সময়ের ডিসিরা) অনেক বড় নেগেটিভ ভূমিকা রেখেছিলেন। কোনো একজন ডিসিও বলেননি- আমি প্রতিবাদ করলাম, আমি রিটার্নিং অফিসার থাকবো না, আমি রিজাইন করলাম, কাজ করবো না।” এদিকে সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ৬৪ জেলার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সুপারদেরও (এসপি) ওএসডি করা হবে এবং বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হবে। তাঁর এই বক্তব্যও প্রশংসার দাবি রাখে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে যেসব নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো কমবেশি ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি’। এরপর ৯০–এর দশকের শুরু থেকে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ অধীনে যে কয়েকটি নির্বাচন হয়েছিলো, সেগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে, দেশে ও বিদেশে গ্রহণযোগত্যা পেয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার পর যে নির্বাচন হয়েছে, এই নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি, যা সকলেই স্বীকার করবেন। ( আমরা মনেকরি, নির্বাচনকে প্রভাবিত করে ক্ষমতায় থাকার জন্যই আ.লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছিল)। মূলত: সুষ্ঠু নির্বাচনে বাঁধা দিয়ে অর্থাৎ ভোট ডাকাতি করে তাঁরা( সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা) ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথকে সহজ করেছিলো।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর যে নির্বাচনকে- আমরা কেউ বলি- বিতর্কিত, কেউ বলি- অগ্রহণযোগ্য, কেউ বলি- ভোট ডাকাতি, কেউ বলি- কারচুপি, কেউ বলি- দিনের ভোট রাতে, কেউ বলি- ড্যামি প্রার্থীর নির্বাচন (শেখ হাসিনা নিজেই ড্যামি প্রার্থী দিয়ে ‘’ড্যামি প্রার্থীর নির্বাচন’’ থিওরি আবিষ্কার করেছিলেন)।
একথা স্বীকার্য যে, বর্তমান বিশ্বের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য সরকার ব্যবস্থা হলো ‘গণতন্ত্র’। বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশেই গণতন্ত্র ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে । গণতন্ত্র হতে উন্নত কোন সরকার ব্যবস্থার ধারণা -আজও কেউ দিতে পারেননি। সাধারণভাবে গণতন্ত্র বলতে বোঝায়, যে শাসন ব্যবস্থায় শাসন ক্ষমতা রাষ্ট্রের সব জনসাধারণের ওপর ন্যস্ত থাকে ( পরোক্ষভাবে) এবং জনগণই তাদের সরকার গঠন করে । গণতন্ত্র হলো- এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত হয়, যাতে প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকার থাকে। সপ্তদশ শতক থেকে আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে নির্বাচন একটি আবশ্যিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ব্যবস্থায় একাধিক রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ থাকে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা এবং রাষ্ট্রের কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও কল্যাণ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা- গণতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্য।
আমাদের দেশের সরকার পদ্ধতিও গণতান্ত্রিক । এখানে জাতীয় সংসদের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এজন্যে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে । নির্বাচনের জন্য নির্বাচনি আচরণবিধি এবং নির্বাচনি আচরণ লঙ্ঘন করার শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক সত্য হলো- বিগত ১৫ বছর গণতন্ত্রের নামে দেশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম হয়েছিল। আর সেটা সম্ভব হয়েছিল- নির্বাচনে ভোট ডাকাতি করে। এই ভোট ডাকাতির অন্যতম সহায়ক শক্তি ছিলো- রিটার্নিং কর্মকর্তারা। যাদের নিকট হতে আজ হিসাব নেয়া হচ্ছে।
একটি বিষয়ে সকলেই একমত যে, বিগত সরকার দূর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলো। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় হতে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত সবাই দূর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিলো। দেশ হতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। আজকে সচিব পর্যায়ের যেসব কর্মকর্তাদের নির্বাচনী অপকর্মের জন্য অবসরে পাঠানো হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ আছে। সুতরাং অবসরে পাঠানোই যেনো শেষ না হয়, তাঁদের দূর্নীতির বিষয়টিও তদন্ত করতে হবে এবং দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দেশ ও জনগণের সম্পদ ডাকাতি করে কেউ যেনো পার পেয়ে না যায়।
একটি বিষয় সবাই জানেন যে, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে শেখ হাসিনার সহযোগী হিসেবে ভোট ডাকাতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন জেনারেল আজিজ। ২০১৪ সালের বিজিবি প্রধান এবং পরবর্তী নির্বাচনে সেনাপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিল। তাকেও অবিলম্বে বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। তার ভাতিজা ‘আসিফ’’ জুলাই বিপ্লবে ছাত্র জনতার উপর গুলি বর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ আছে। একটি ‘সন্ত্রাসী পরিবারের’’ সদস্য হওয়া সত্বেও এই জেনারেল আজিজকে সেনাপ্রধান বানিয়েছিলেন শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনকে পাকাপোক্ত করার জন্য। যা ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রচারিত আল জাজিরার তথ্যচিত্র ‘অল দ্যা প্রাইম মিনিস্টারস ম্যান’’ এ পরিষ্কার উঠে এসেছে। সেখানে জেনারেল আজিজের ভাইকে সরাসরি বলতে শোনা গেছে, তিনি র্যাব-সেনাবাহিনী দিয়ে যে কাউকে উঠিয়ে আনতে পারেন এবং শতকোটি টাকা ঘুষ দিয়ে সব কাজ করাতে পারেন। ব্যবসায়ী মোস্তাফিজ হত্যা মামলায় জেনারেল আজিজের অন্য দুই ভাই হারিছ আহমেদ ও আনিস আহমেদের যাবজ্জীবন সাজা হয়। মৃত্যুদণ্ড হয় তোফায়েল আহমেদ জোসেফের। কিন্তু শেখ হাসিনার সুপারিশে রাষ্ট্রপতি তাঁদের ক্ষমা করে দেন। যা ছিল কলংকজনক ঘটনা । জেনারেল আজিজের আরেক ছোট ভাই টিপু আহমেদ ১৯৯৯ সালে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়েছিলেন। একটি খুনি ও সন্ত্রাসী পরিবারের একজনকে দেশের সেনা প্রধান বানিয়ে শেখ হাসিনা বিশ্বের কাছে দেশের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করেছিলেন।
কেউ কেউ মনে করেন, জেলা প্রশাসকদের অনেকেই চাপে বাধ্য হয়ে হয়ত সরকারের পক্ষে কাজ করেছিলেন। (কিন্তু তাঁরা সেটা কার্যকলাপে প্রমান করতে পারেননি)। কিন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তোষামোদ করার প্রতিযোগিতা চলছিল ভবিষ্যতের ফায়দা লুটার মানসিকতা থেকে। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, বাংলাদেশে সরকারি আমলাদের কোন রাজনৈতিক দল ‘নিরপেক্ষ ভাবে’ কাজ করতে দেয় না। আবার আমলারাও স্বেচ্ছায় (দূর্নীতি মানসিকতার কারণে) সরকারের তোষামোদ করার জন্য ‘নিরপেক্ষ’ থাকেন না। বিশ্বের অন্যান্য দেশে আমলাদের নিরপেক্ষ ভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়। আমরা যদি অন্যায়ের জন্য আমলাদের শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারি, ভবিষ্যতে তাঁরা অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকবে।
আমরা মনেকরি, নির্বাচনী অপরাধকে ‘’বিধি লংঘন’’ বলে হালকা করে দেখার সুযোগ নাই। কারণ নির্বাচনে কারচুপি তথা ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ‘পুরো দেশকেই ডাকাতি’ করা হয়। সামান্য সিঁধেল চুরির জন্য যদি জেল হয়, তাহলে রাষ্ট্র ডাকাতির জন্য কেনো জেল হবে না? এখন সময়ের দাবি হলো, ভোট ডাকাতিকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’’ হিসেবে গণ্য করতে হবে। নির্বাচন চলাকালীন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে স্পেশাল ট্রাইবুনালের মাধ্যমে নির্বাচনী অপরাধের বিচার করতে হবে। এরজন্য নির্বাচনী আইনের সংস্কার করা খুবই জরুরি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে যে সব সরকারি কর্মকর্তারা নির্বাচনকে ধ্বংস করেছেন -আজকে তাঁদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে, যা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। আমরা এমন আইন চাই, যেনো ভবিষ্যতে কোন স্বৈরাচার ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য সাহস করবে না। দেশে গণতন্ত্রকে শক্তিশালি করার জন্য ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য-আইনের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থার সুরক্ষা দেয়া অতীব জরুরি।
লেখক : মুহাম্মদ মুসা খান কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।