কাস্টমস হ্যাকিংয়ের বলি শিপিং এজেন্ট: নেপথ্যে কারা? ব্যবসায়িক মহলে তীব্র আতঙ্ক!
নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম বন্দর
২০২২ সালের চাঞ্চল্যকর মদের চালান খালাস কেলেঙ্কারি ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শান্ত হয়নি। তবে আসল অপরাধীদের আড়াল করে নির্দোষ শিপিং এজেন্ট-কে ‘বলির পাঠা’ বানানোর এক নতুন খেলা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক আইন ও কাস্টমস বিধিমালা তোয়াক্কা না করে স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে আইনি জালে ফাঁসানোর এই ঘটনায় দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।
ডিজিটাল জালিয়াতির নেপথ্যে কী ঘটেছিল?
২০২২ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে কাস্টম হাউসের আইডি ও পাসওয়ার্ড হ্যাক করে এবং ওটিপি (OTP) জালিয়াতির মাধ্যমে পাঁচটি মদের চালান অবৈধভাবে খালাস করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তদন্তে দেখা যায়, কাস্টমসের এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে অবৈধ অনুপ্রবেশ করা হয়েছিল নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকা থেকে ভিন্ন আইপি ব্যবহার করে।
প্রাথমিক তদন্ত ও মামলার এজাহারে কোথাও কোনো শিপিং এজেন্ট-এর নাম ছিল না। এমনকি পিবিআই-এর (PBI) প্রথম দফার তদন্তেও কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তদন্তের গতিপথ পরিবর্তন করে ‘রিচফিল্ড শিপিং (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেড’-কে আসামি করা হয়। অথচ একই ধরনের ঘটনায় যুক্ত অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই দ্বিমুখী নীতি বা ‘আইনি বৈষম্য’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশন।
কেন শিপিং এজেন্ট-এর ওপর দায় চাপানো অযৌক্তিক?
শিপিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (The Hague Rules, 1924) অনুযায়ী কনটেইনারের ভেতরে কী পণ্য আছে, তা দেখার আইনি সুযোগ বা কারিগরি ক্ষমতা শিপিং এজেন্ট-এর নেই।
শিপার্স লোড, কাউন্ট এন্ড স্টো: পণ্য বিদেশে সিলগালা করা হয়। এজেন্ট শুধু ভাড়ার বিনিময়ে জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানোর দলিলাদি (IGM) কাস্টমসে দাখিল করে।
দায়ভার কার? হামবুর্গ রুলস (1978) এবং ১৯২৫ সালের ক্যারেজ অফ গুডস বাই সি অ্যাক্ট অনুযায়ী, পণ্যের বর্ণনার সত্যতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এককভাবে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের।
শুল্কের সাথে সম্পর্কহীন: শিপিং এজেন্ট কেবল পরিবহন সহায়কের ভূমিকা পালন করে। শুল্ক ফাঁকি বা মিথ্যা ঘোষণার দায়ভার কোনোভাবেই তাদের ওপর বর্তায় না।
হুমকির মুখে ব্লু-ইকোনমি ও বিদেশি বিনিয়োগ
নির্দোষ শিপিং এজেন্ট-কে ফৌজদারি মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করায় বিদেশি শিপিং লাইনগুলো (Principals) আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। রিচফিল্ড শিপিংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ভিত্তিহীন মামলার ফলে তাদের ব্যবসায়িক সুনাম ধুলোয় মিশেছে।
সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো বাংলাদেশ থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে পারে। এর ফলে দেশের ব্লু-ইকোনমি মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং তৈরি হতে পারে চরম বেকারত্ব।
হস্তক্ষেপ জরুরি
প্রকৃত ডিজিটাল হ্যাকার এবং জালিয়াতির মূল হোতা আমদানিকারকদের বাদ দিয়ে কেন বারবার শিপিং এজেন্ট-কে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, তা নিয়ে খোদ বন্দর নগরীতে তোলপাড় চলছে। ব্যবসায়িক স্থবিরতা কাটাতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় কাস্টমস ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।
ইজতিহাদ/জিএন